Wednesday, November 15, 2023

১ম খুতবাহ - ফিলিস্তিন যুদ্ধ ২০২৩

 

১ম খুতবাহ

سُبْحَـٰنَ ٱلَّذِىٓ أَسْرَىٰ بِعَبْدِهِۦ لَيْلًۭا مِّنَ ٱلْمَسْجِدِ ٱلْحَرَامِ إِلَى ٱلْمَسْجِدِ ٱلْأَقْصَا ٱلَّذِى بَـٰرَكْنَا حَوْلَهُۥ لِنُرِيَهُۥ مِنْ ءَايَـٰتِنَآ ۚ إِنَّهُۥ هُوَ ٱلسَّمِيعُ ٱلْبَصِيرُ

পবিত্র ও মহিমাময় তিনি যিনি তাঁর বান্দাকে রাতে ভ্রমণ করিয়েছিলেন মাসজিদুল হারাম হতে মাসজিদুল আকসায়, যার পরিবেশ আমি করেছিলাম বারাকাতময়, তাকে আমার নিদর্শন দেখানোর জন্য; তিনিই সর্বশ্রোতা, সর্বদ্রষ্টা। সুরাহ ইস্রা – আয়াহ ১।

বায়তুল মাকদিসকে ইসরা মিরাজের বরকতময় যাত্রা সম্পর্কে হাদিসেও উল্লেখ করা হয়েছে যা নবী মোহাম্মদ রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর অন্যতম অলৌকিক ঘটনা হিসেবে ঘটেছিল।

নবী মুহাম্মদ রাসুলুল্লাহ (সাঃ) বলেছেন,আমি বুরাকের উপর আরোহণ করলাম এবং বায়তুল মাকদিসে পৌঁছনো পর্যন্ত নামলাম না। সেখানে আমি এটিকে নবীদের ব্যবহার করা একটি আঙটার সাথে বেঁধে রেখেছিলাম এবং তারপর দুই রাকাত সালাত আদায় করেছি। তখন আমাকে জান্নাতে উঠানো হয়েছিল।" (সহীহ মুসলিম)

এই মসজিদটি মুসলমানদের জন্য প্রথম কিবলা ছিল এবং আমাদের প্রিয় নবী মোহাম্মদ (সাঃ) স্পষ্টভাবে মুসলমানদের এটি দেখার জন্য উত্সাহিত করেছিলেন।

আল শাম (ফিলিস্তিন) ছিল নবী ইব্রাহিম, ইসহাক, ইয়াকুব, দাউদ, সুলায়মান, জাকারিয়া, ইয়াহিয়া এবং ঈসা (আলাইসিহ সাল্লাম)-এর আবাসস্থল। তারা সবাই ফিলিস্তিনে অন্যান্য অনেক নবীর মধ্যে বসবাস করতেন। ঈসা (.)-এর অলৌকিক জন্মও ফিলিস্তিনেই হয়েছিল। এটাও বলা হয় যে ইব্রাহিম আঃ এবং ইসহাক আঃ কে আল শামে সমাহিত করা হয়েছে।

ফিলিস্তিন আমাদের আকিদার সাথে দৃঢ়ভাবে যুক্ত। এখন সবাই জানে গাজা, পশ্চিম তীর, হেবরন, জেরুজালেমে গত এক সপ্তাহ ধরে কী ঘটছে। আমি বিশদ বিবরণে যাচ্ছি না কত মুসলমান শহীদ হয়েছে বা কীভাবে ইসরাইল খাদ্য, পানি, বিদ্যুৎ বা ওষুধের মতো মৌলিক চাহিদার সরবরাহ বন্ধ করে দিয়েছে।

কিন্তু কিছু বিষয় চিন্তা করতে হবে: ইসরাইল পশ্চিমা দেশগুলোর একটি প্রকল্প। সাইকস-পিকট চুক্তি, ক্যাম্প ডেভিড চুক্তি, অসলো চুক্তি, বেলফোর ঘোষণার ইতিহাসের দিকে তাকালে আপনি স্পষ্ট ধারণা পেতে পারেন কীভাবে প্যালেস্টাইন বিক্রি করা হয়েছিল এবং আরব শাসকরা কীভাবে বিশ্বাসঘাতকতা করেছিল।

ইসরায়েল দুর্বল, এটি একটি মিথ যে ইসরাইল অপারেজয়। তারা মিশর, জর্ডান, তুরস্ক ইত্যাদি প্রতিবেশী দেশ থেকে গ্যাস, জ্বালানি, আকাশপথ সবকিছু পায়। তারা সম্পূর্নরুপে মুসলিম দেশগুলোর উপর নির্ভরশীল।

হামাসের মতো ক্ষুদ্র মিলিশিয়া তাদের নাড়া দিতে পারে। তারা ঘরে তৈরি রকেট এবং প্যারাগ্লাইডার এবং ড্রোন তৈরি করেছে যা ইজরায়েলের শহরগুলিকে ধ্বংস করতে পারে, তথাকথিত সবচেয়ে শক্তিশালী সেনাবাহিনী কোন কুলকিনারা করার আগেই তারা ধরাশায়ী হয়েছে।

গত বছর ধরে যখন ইউক্রেন রাশিয়ার সাথে যুদ্ধ করার জন্য ২০ বিলিয়ন ডলার সহায়তা পেয়েছিল, তারা অবিলম্বে সপ্তাহে গাজার সাথে যুদ্ধ করার জন্য ৮ বিলিয়ন ডলার পেয়েছে ।

মানচিত্রে দেখলে দেখা যায় সব মুসলিম ভূখণ্ডের মাঝখানে ইসরাইল। তুরস্ক, সৌদি, ইয়েমেন, মিশর, জর্ডান, সিরিয়া, লেবানন, ইরান, ইরাক প্রভৃতি মুসলিম ভূখণ্ডের দুর্নীতিগ্রস্ত মুনাফিক অত্যাচারী শাসকদের সমর্থন ছাড়া একটি ক্ষুদ্র সত্তা কীভাবে বিদ্যমান থাকবে?

শেখ তাকিউদ্দীন আন নাবাহনী (রহিমুল্লাহ) বলেন, ইসরাইল আরব শাসকগোষ্ঠীর ছায়া ছাড়া আর কিছুই নয়। সুতরাং, যদি তাদের অস্তিত্ব ধ্বংস হয়ে যায়, তবে তাদের ছায়া (যা ইসরাইল) অস্তিত্বহীন হয়ে যাবে। তার মানে এই মুনাফিকরা কলুষিত আরব সরকার ইসরাইলকে বাঁচিয়ে রেখেছে।

ইসরায়েল একটি দুর্বল দেশ, যে দেশের নাগরিকরা পালিয়ে গেছেন সেসব দেশে যেখান থেকে তারা এসেছিল যেমন পোল্যান্ড, জার্মানি, বেলজিয়াম, ইউক্রেন ইত্যাদি।

আমরা ইসরায়েলের জন্য সমস্ত পশ্চিমা মিডিয়ার চিৎকার দেখেছি এবং গাজায় এখন যে গণহত্যা ঘটছে তাতে সমস্ত পশ্চিমা সরকার সমর্থন করছে। ডবল স্ট্যান্ডার্ড নতুন নয় এবংএটা আশ্চর্যজনক নয় যা আমরা ইরাক এবং আফগান যুদ্ধের সময় “সন্ত্রাস এর বিরুদ্ধে যুদ্ধ” নামে প্রত্যক্ষ করেছি।

মুসলিম রাজনীতিবিদ ধর্মীয় সংগঠনগুলো ফিলিস্তিনের পক্ষে বিবৃতি তৈরি করছে যা লক্ষ্য করা যাচ্ছে যা বেশীর ভাগ কুমিরের কান্না, এবং তাদের কেউ কেউ এখন পর্যন্ত নীরব, যা স্পষ্ট ভণ্ডামি। এবং এছাড়াও, আমরা গত সপ্তাহে সিডনির বৃহত্তম মসজিদগুলির মধ্যে একটিতে অস্ট্রেলিয়ান মন্ত্রীদের সাথে কাঁধে কাঁধ ঘষতে দেখেছি, যারা ইতিমধ্যেই ঘোষণা করেছে যে ইসরায়েল তার নিজেকে রক্ষা করার অধিকার রয়েছে।

কিছু রাজনীতিবিদ ২টি রাষ্ট্রীয় সমাধান (টু স্টেট সলিশন) প্রতিষ্ঠার জন্য পুনর্ব্যক্ত করছেন যা শেষ পর্যন্ত স্থানীয় ফিলিস্তিনি মুসলমানদের সাথে বিশ্বাসঘাতকতা এবং স্পষ্টভাবে ইসরায়েলের অবৈধ রাষ্ট্রকে বৈধতা দেয়।

কিছু সাধারণ মুসলমান ইসরায়েলের নিরপরাধ বেসামরিক নাগরিকদের হত্যার বিষয়ে উদ্বিগ্ন - প্রকৃতপক্ষে তারা নিছক বেসামরিক নাগরিক নয় বরং তারা স্বেচ্ছায় ইসরায়েলের একটি অবৈধ রাষ্ট্রে বসবাস করতে বেছে নিয়েছে, তারা ফিলিস্তিনের প্রতিটি ইঞ্চি দখলকে উপভোগ করেছে, তারা মুসলমানদের জমি চুরি করতে বেছে নিয়েছে

কিছু সাধারণ মুসলমান বলেন, হামাস যুদ্ধের সূচনা করেছিল, কিন্তু আসলে তাদের শিকল ভাঙার বা জেল ভাঙার অধিকার রয়েছে। তারা ৭৫ বছর ধরে বন্দি হয়ে মানবেতর জীবনযাপন করছে।

এখন অস্ট্রেলিয়ায় বসবাসরত মুসলিম হিসেবে আমরা কী করতে পারি?

নির্যাতিত মুসলমানদের সমর্থন করা / অবৈধ আগ্রাশন এর প্রতিবাদ করা  এবং ভালো কাজের নির্দেশ দেওয়া এবং অসৎ কাজে নিষেধ করা (আমর বিল মা’রুফ ওয়া নাহি আনিল মুনকার) কারণ তা ইবাদাত এর অংশ।

রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, “মুমিনদের পরস্পরের প্রতি তাদের স্নেহ, করুণা সহানুভূতির দৃষ্টান্ত একটি দেহের মতো। যখন কোন অঙ্গে ব্যথা হয়, তখন সমস্ত শরীর ঘুমহীনতা এবং জ্বরের সাথে প্রতিক্রিয়া জানায়" (সহীহ মুসলিম)

সারা বিশ্বের মুসলমানরা প্রতিবাদ করছে, দান করছে, দোআ করছে (কুনুত নাজালা), সোশ্যাল মিডিয়ায় হ্যাশট্যাগ দিয়ে স্ট্যাটাস দিচ্ছে। কিন্তু আমরা সবসময় একটা জিনিস মিস করি আর সেটা হল সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ – আর তা হল জিহাদ ফি সাবিলিল্লাহ। একটি সামরিক সমস্যা সামরিক পদক্ষেপ দ্বারা সমাধান করা হবে যা জিহাদ। ফিলিস্তিনের জনগণের আমাদের দেওা অর্থ খাবারের প্রয়োজন নেই, তাদের প্রয়োজন মুসলিম সেনাবাহিনীর সহায়তা।

রাশিয়া যখন ইউক্রেন আক্রমণ করে তখন ইউরোপের সব দেশ যুক্তরাষ্ট্র সাহায্য করেছিল। ইসরাইল যখন ফিলিস্তিনে হামলা চালায় তখন মুসলিম দেশসহ সারা বিশ্বের সমর্থন পায় ইসরাইল কিন্তু ফিলিস্তিন নয়।

ফিলিস্তিনকে সাহায্য করবে কে? উত্তরটা পরিষ্কার- যতক্ষণ না মুসলিম সৈন্যরা অগ্রসর হচ্ছে ততক্ষণ পর্যন্ত ফিলিস্তিন মুক্ত হবে না। ৫% মুসলিম সেনাবাহিনী দিনের মধ্যে ইসরায়েলের অবৈধ রাষ্ট্রকে ধ্বংস করতে পারে।

দখলদারিত্বের মাধ্যমে ইসরাইল সৃষ্টি হয়েছে, এবং সামরিক হস্তক্ষেপের মাধ্যমে, খিলাফাহ প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে মুসলিম ভূমিতে সামরিক হস্তক্ষেপ এবং একত্রীকরণের পুরো প্রক্রিয়াটি উল্টে দিয়ে ইসরাইলকে উৎখাত করা হবে। ফিলিস্তিন ইস্যু শুধু ফিলিস্তিনের জনগণের উপর নয়। ফিলিস্তিন ইস্যু শুধু আরবদের উপর নয়। এটা আরব বা অনারব সকল মুসলিমের উপর।

 

২য় খুতবাহ

ইসলামের ভাইয়েরা, ফিলিস্তিনের ভাগ্য সবসময় উম্মাহর ভাগ্যের সাথে যুক্ত।

যদি উম্মাহ পুনরুজ্জীবিত হয় এবং ঐক্যবদ্ধ হয়, তবে আমাদের জমি, আমাদের রক্ত এবং আমাদের সম্মান নিরাপদ।

সুতরাং, ফিলিস্তিন ইস্যুটি একটি বড় সমস্যার একটি লক্ষণ মাত্র, উম্মাহর পতনের কারণে আমরা অনেকগুলি সমস্যার মুখোমুখি হই  যেমন -  সিরিয়া/কাশ্মীর/আরাকান/তুর্কিস্তান ইত্যাদি।

সুলতান আব্দুল হামিদ দ্বিতীয়ের নেতৃত্বে উসমানী খিলাফাহ (এমনকি তার দুর্বলতম সময়েও) ফিলিস্তিনের ভূমি সংরক্ষণ করে এবং উনবিংশ শতকের গোড়ার দিকে তাদের এক ইঞ্চি বিক্রী করে দিতে অস্বীকার করেন।

যেমন রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, "ইমাম একটি ঢাল স্বরুপ, যার পিছনে মুসলিম যুদ্ধ করে এবং নিজেকে রক্ষা করে.." (সহীহ মুসলিম)

এই হাদিসের দ্বারা উম্মাহর একজন ধার্মিক ইমামের গুরুত্ব বুঝা যায়। আজ আমাদের এই ঢাল নেই যা ফিলিস্তিনের উম্মাহ এবং বিশ্বের অন্যান্য অংশের উম্মাহকে রক্ষা করতে পারে।

আমরা এক উম্মত। কোনো কৃত্রিম সীমানা আমাদের আলাদা করতে পারবে না, একীকরণের জন্য জাতীয়তাবাদের আহ্বানকে প্রত্যাখ্যান করতে হবে। আমরা অস্ট্রেলিয়ান, পাকিস্তানি, লেবানিজ বা মালয়েশিয়ান হওয়ার আগে আমরা মুসলিম, এবং আমরা একক ভ্রাতৃত্ব।

সালাহউদ্দিন আল আইয়ুবি কুর্দিস্তান থেকে এসেছিলেন যিনি মুসলিম সেনাবাহিনীকে একত্রিত করেছিলেন এবং ১১৮৭ সালে হিতিনের যুদ্ধে আল আকসাকে ক্রুসেডারদের হাত থেকে মুক্ত করেছিলেন।

সাইফুদ্দিন কুতুজ ছিলেন মামলুক সুলতান যিনি ১২৬০ সালে আইন জালুতের যুদ্ধে বায়ত আল মাকদিস মুক্ত করার জন্য মিশর থেকে একটি সেনাবাহিনীর নেতৃত্ব দিয়েছিলেন।

সুতরাং, আজ যা ঘটছে তা অতীতে ঘটেছে, ক্রুসেডারদের সময় ৮৮ বছর ধরে আল আকসায় কোন প্রার্থনা অনুষ্ঠিত হয়নি, তারপর মুসলিমরা এটিকে মুক্ত করেছিল। এখন আবার সময় এসেছে মুক্তির ডাক, শুধু দোয়া এবং সাদাকা দানের নয়।

 

আল্লাহ আমাদের কবুল করুন যাতে আমরা এই পুনরুজ্জীবনে ভূমিকা পালন করতে পারি, আমরা কেবলমাত্র খবর পড়ে দুঃখ না পাওার পরিবর্তে হক বাতিলের (সত্য ও মিথ্যার) মধ্যে সংঘর্ষে দাঁড়াতে পারি। আল্লাহ তায়ালা ফিলিস্তিন অন্যান্য সকল মুসলিম ভূখন্ডের মুক্তি ত্বরান্বিত করুন, আমিন।

No comments: