Wednesday, November 15, 2023

৩য় খুতবাহ - ফিলিস্তিন যুদ্ধ ২০২৩

 ১ম খুতবাহ

ভাইয়েরা, এই তৃতীয় সপ্তাহেও আমরা ফিলিস্তিনের পবিত্র ভূমি থেকে দুঃখজনক ভিডিও এবং বিধ্বংসী খবরের সাক্ষী হচ্ছি। গত ২ সপ্তাহের মত আজকের খুতবাহতে আমি গাজা যুদ্ধ ছাড়া অন্য কিছু নিয়ে আলোকপাত করতে চেয়েছিলাম যেমন: সঠিক ইসলামী ব্যক্তিত্ব, বা কুরআনের আলোকে সত্যিকারের সাফল্য ইত্যাদি। কিন্তু আমি নিজেকে সংযত করতে পারি নি। আমি অন্য কিছুতে ফোকাস করতে চেয়েছিলাম সবকিছু, কিন্তু গাজ্জা শহরের ধ্বংসই শুধু আমার মনে আসে বারবার।

তাহলে সমাধান কি? আসুন কুরআনের একটি আয়াত দেখি:

তারা বললঃ হে মূসা! নিশ্চয়ই আমরা কখনও সেখানে পা রাখবনা যে পর্যন্ত তারা সেখানে বিদ্যমান থাকে। অতএব আপনি ও আপনার রাব্ব (আল্লাহ) চলে যান এবং উভয়ে যুদ্ধ করুন, আমরা এখানেই বসে থাকব। সুরাহ মায়িদাহ আয়াহ ২৪।

আসুন এই আয়াতে চিন্তা করি। এখানে বনী ইসরাঈলের লোকদেরকে জেরুজালেমে যেতে এবং মুসা আ.-এর সাথে শহরে প্রবেশ করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু তারা অস্বীকার করল এবং বলল, “তুমি এবং তোমার আল্লাহ গিয়ে যুদ্ধ কর। আমরা এখানেই বসে আছি। আমরা কি একই কাজ করছি না? আমরা কি আল্লাহর কাছে লাঞ্ছিত বনী ইসরাইলদের পদাঙ্ক অনুসরণ করছি না? মুসলিম উম্মাহ হিসেবে আমরা কি এখন বিশ্বে অপমানিত নই?

আমরা প্রার্থনা করছি, "হে আল্লাহ ফিলিস্তিনকে রক্ষা করুন (Save Palestine)" বা "হে আল্লাহ, ফিলিস্তিন মুক্ত করুন (Free Palestine)" এবং দোয়া করার পর আমরা এখানে বসে আছি এবং ফিলিস্তিনকে বাঁচাতে যাচ্ছি না। ঠিক এই একই কথা বনি ইসরাইল আল্লাহকে বলেছিল, “হে আল্লাহ তুমি যুদ্ধ কর আমরা যাবো না। এই ব্যাপারে চিন্তা করুন, তারা জেরুজালেমে যাননি, আমরা কেউ জেরুজালেমেও যাচ্ছি না। আমরা নয়, অন্তত সৌদি, জর্ডান, সিরিয়া, লেবানন, তুরস্ক, মিসরের মতো মুসলিম ভূমি থেকে আমাদের মুসলিম সেনাবাহিনীর না যাওার কোন অজুহাত নাই।

কিন্তু নবী মোহাম্মদ সাঃ এর সময়ে সাহাবা রাঃ এর অবস্থান কি ছিল? যখন রাসুলুল্লাহ (সাঃ) মুহাজিরদেরকে জিহাদের ডাক দিয়েছিলেন (কারণ তখন আনসারদের উপর জিহাদ ফরজ ছিল না), তখন আনসারদের নেতা সাদ ইবনে মুআদ রাঃ বললেন, “হে রাসুলুল্লাহ সাঃ, আমরা আপনার সাথে চলব, আমরা এমন বলব না। বনী ইসরাঈলের লোকেরা "আপনি এবং প্রভু যুদ্ধ করতে যান এবং আমরা এখানে বসে আছি"। না, নবী মোহাম্মদ সাঃ এর সাহাবী এই কথা বলেননি, তারা শুধু আল্লাহর কাছে প্রার্থনা করেছিলেন, “হে আল্লাহ বদর যুদ্ধে মুসলমানদের রক্ষা করুন,  বরং তারা অগ্রসর হয়েছিল।

মুসলমানদের আজকের অবস্থার সাথে সম্পর্কিত আরেকটি আয়াত গভীরভাবে দেখা যাক:

“অতঃপর সেই তোমরাই পরস্পর খুনাখুনি করছ এবং তোমরা তোমাদের মধ্য হতে এক দলকে তাদের গৃহ হতে বহিস্কার করে দিচ্ছ, তাদের বিরুদ্ধে (শত্রুতা বশতঃ) পাপ ও অন্যায় কাজে সাহায্য করছ এবং তারা বন্দী হয়ে তোমাদের নিকট আনীত হলে তোমরা তাদেরকে বিনিময় প্রদান কর, অথচ তাদেরকে বহিস্কার করা তোমাদের জন্য অবৈধ ছিল, তাহলে কি তোমরা গ্রন্থের কিছু অংশ বিশ্বাস কর এবং কিছু অংশ অবিশ্বাস কর? তোমাদের মধ্যে যারা এরূপ করে তাদের পার্থিব জীবনে দুর্গতি ব্যতীত কিছুই নেই এবং উত্থান দিনে তারা কঠোর শাস্তির দিকে নিক্ষিপ্ত হবে এবং তোমরা যা করছ, তদ্বিষয়ে আল্লাহ অমনোযোগী নন।“ সুরাহ বাকারাহ। আয়াত ৮৫

ভাইয়েরা, এই আয়াতটি বনী ইসরাঈলের সাথে সম্পর্কিত। তাদের নিজেদের মধ্যে অনেক গোত্র থাকতো। তারা একে অপরের সাথে মারামারি করেছে। আর শত্রুরা যখন এক গোত্রকে আক্রমণ করত তখন তারা অন্য গোত্রের বিরুদ্ধে শত্রুকে সাহায্য করত। কিন্তু যুদ্ধের পর একজাতি অন্য জাতির মুক্তিপণ দিত এবং বন্দীদের মুক্ত করত এবং অন্য গোত্রকে তাদের উদারতার কথা স্মরণ করিয়ে দিত। এখানে এই আয়াতে আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তালা তাদের নৃশংসতা ও নিপীড়ন সম্পর্কে তিরস্কার করেছেন। আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালা তাদের সমালোচনা করেছেন কারণ তারা কিতাবের একটি অংশ অনুসরণ করেছে এবং অন্য অংশ লঙ্ঘন করেছে। এটা স্পষ্ট ভন্ডামি ও দুর্নীতি। আমি এখানে কিছুক্ষণের জন্য বিরতি দিচ্ছি। চিন্তা করুন।  আপনি কিছু বুঝতে পারছেন? মুসলিম ভূখন্ডের শাসকরা কি এমন নয়? তারা ফিলিস্তিন আক্রমণে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, ইসরাইলকে সাহায্য করে। তারা তাদের সীমানা বন্ধ, তারা নিশ্চুপ। তারা মুসলমানদের কাছে সামরিক সরঞ্জাম ও সৈন্য পাঠাচ্ছে না। তারা মিঃ বিডেন, মিঃ সুনাকের সাথে বৈঠক করছেন। তারা তাদের ভুখন্ডতে বিক্ষোভকারীদের গুলি করছে যাতে তাদের শান্ত রাখা যায় যাতে যুদ্ধ আরও বাড়তে না পারে। ইসরায়েল একবার হাসপাতালে বোমাবর্ষণ করার সময় কিছু অসার বিবৃতি দিয়েছে যা কুমিরের কান্না ছাড়া আর কিছুই নয়।

অন্যদিকে দেশের রাষ্ট্রপতি ও রাজারা খাদ্য, ওষুধ এবং মৃতদেহের কাফন (সাদা কাফন কাপড়) পাঠাচ্ছেন। বনী ইসরাঈল ঠিক এটাই করত। ফিলিস্তিনি জনগণের জন্য এসব রাষ্ট্রের নিন্দাজ্ঞাপন প্রয়োজন নেই, তাদের মুক্তি দরকার।

ফিলিস্তিনি জনগণের অনুদানের প্রয়োজন নেই, তাদের সামরিক হস্তক্ষেপ প্রয়োজন।

আল্লাহ আমাদের হেদায়েত দান করুন যাতে আমরা বনী ইসরাঈলের শ্রেণীতে না পড়ি।

যারা ফিলিস্তিনের মুক্তির জন্য অবদান রাখতে পারে তাদের একজনকে আল্লাহ আমাদের কবুল করুন।

আল্লাহ যেন ফিলিস্তিনের নির্যাতিতদেরকে শহীদ হিসেবে কবুল করেন এবং জান্নাতুল ফেরদৌস দান করেন। আমিন।

 

২য় খুতবাহ

ইসরাইল কি অপরাজেয়? মুসলিম কি ইসরায়েলের সাথে জিততে পারবে? এক নজর বাস্তবতা দেখা যাক।

ইসরায়েলের সামরিক বাজেট ২৪ বিলিওন, আরব মুসলিম দেশগুলোর বাতসরিক সামরিক বাজেট ৭৬৫ বিলিওন, যা ৩০ গুন।

এখানে শুধু ঈস্রাইল এর পার্শবর্তি আরব মুসলিম দেশগুলোকে বিবেচনা করা হয়েছে, পাকিস্থান, বাংলাদেশ, মালায়সিয়া, ইন্দোনেশিয়া, নাইজেরিয়া, সুদান বা সোমালিয়া এসব কে বিবেচনা করা হয় নি।

সামরিক সৈন্য ইজরায়েল ৬৪৫ হাজার , আরব মুসলিম মিলিওন ( গুন)

ট্যাঙ্ক ইজরায়েল হাজার, মুসলিম আরব ১৬. হাজার ( গুন)

আর্টিলারি ইসরায়েল এর ৬৫০ টি , আরব মুসলিম ৪০০০ টি (যা গুন)

সাঁজোয়া যান ইসরায়েলের ৫০ হাজার, আরব মুসলিম ৫০০ হাজার (১০ গুন)

রকেট ইস্রায়েলের ৩০০ টি এবং আরব মুসলিম  ,৫০০ (১১ গুন)

যুদ্ধ বিমান  ইস্রায়েলের ৬০০ টি এবং আরব মুসলিম এর ৬০০০ (১০ গুন )

হেলিকপ্টার ইস্রায়েলের  ১২৭ টি এবং আরব মুসলিম এর ২০০০ হাজার (১৫ গুন)

যুদ্ধ জাহাজ ইস্রায়েলের ৬৭ টি এবং আরব মুসলিম  এর ১৩০০০ টি (২০ গুন )

সাবমেরিন ইস্রায়েলের টি, আরব মুসলিম দেশ গুলোর টি

 

তাহলে দেখা যাচ্ছে, সামরিক শক্তি দিয়ে আসলে ইস্রাইল - আরব মুসলিম দেশগুলোর ধারের কাছেও নাই। ইস্রাইল আসলে টিকে আছে শুধু মাত্র আরব মুসলিম দেশগুলোর মুনাফিক রাষ্ট্রপ্রধান এর নিরাপত্তায়। যেদিক এসব রাষ্ট্রপ্রধান গুলোর উচ্ছেদ হবে, সেদিন ইস্রাইলএর ও পতন হবে।

কিন্তু এখন দেখা যাচ্ছে ফিলিস্তিন (গাযা) তে আক্রমন করার জন্য এমেরিকা প্রথমেই এক যুদ্ধবিমানবাহি রনতরী পাঠিয়ে দিইয়েছে। এছাড়া বৃটেন বিমান বোঝাই করে গোলাবারুদ পাঠিয়েছে। ফ্রান্স জার্মানি সবসময় তৈরি যেকোন সময় সামরিক সহায়তার জন্য। এমেরিকা ১ম সপ্তাহেই ৮ বিলিওন ডলার সহায়তা দিয়েছে (যা ইউক্রেন এর ১ বছরের যুদ্ধের সমান)। ছোট একটা শহর গাজার জন্য মনে হচ্ছে সমগ্র বিশ্ব একসাথে ঝাপিয়ে পড়েছে।

রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাদের বর্তমান অবস্থার কারণ বর্ণনা করেছিলেন যখন তিনি বলেছিলেন: 'জাতিগুলি শীঘ্রই তোমাদেরকে আক্রমণ করার জন্য একে অপরকে ডেকে আনবে, যেমন লোকেরা খাওয়ার সময় অন্যদেরকে তাদের থালা ভাগ করার জন্য আমন্ত্রণ জানায়।' কেউ জিজ্ঞাসা করেছিল: 'এটি কি আমাদের কারণে হবে? সে সময় কি (মুসলমানদের) সংখ্যা কম হবে?' তিনি বললেন: 'না, সে সময় তোমরা সংখ্যায় (অনেক) হবে, কিন্তু তোমরা হবে ময়লা আবর্জনার মতো যা স্রোতের প্রবাহ দ্বারা বয়ে যায় এবং আল্লাহ তোমাদের শত্রুদের বুক থেকে তোমাদের ভয় দূর করে দেবেন এবং অন্তরে আল-ওয়ান দিয়ে দিবেন।' কেউ জিজ্ঞেস করল: 'হে আল্লাহর রাসূল, আল-ওয়ান কী?' তিনি বললেন: 'দুনিয়ার প্রতি ভালোবাসা এবং মৃত্যুকে অপছন্দ করা।' (আবু দাউদ ৪২৯৭)

আমরা সবসময় এই থেকে পরিথান এর জন্য দোয়াই কাম্য বলে ক্ষান্ত হই। কিন্তু আমাদের দোয়া আল্লাহ কবুল করবেন কেন? আমরা কি দোয়া কবুলের শর্ত মানছি?

আয়েশা (রাঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে বলতে শুনেছি: ‘ভালো কাজের আদেশ কর এবং মন্দ কাজ থেকে নিষেধ কর, তা নাহলে তুমি দুআ করবে কিন্তু দোয়া কবুল হবে না”।   (সুনানে ইবনে মাজাহ ৪০০৪)

আমরা তো নিজেকে নিয়েই ব্যাস্ত। নিজের নামাজ রোজা করেই মনে করছি সব আদায় করে ফেলেছি। অথচ ইসলাম এর অনেক গুরুত্বপূর্ন একটি স্তম্ভ হল “ভালো কাজের আদেশ করা এবং মন্দ কাজ থেকে নিষেধ করা” (আরবিতে - আমর বিল মারুফ ওয়া নাহি আনিল মুনকার) । আর জালিম শাসক কে জবাবদিহিতা করা হল সবচেয়ে উত্তম “ভালো কাজের আদেশ করা এবং মন্দ কাজ থেকে নিষেধ করা” ।

আল্লাহ সুবহানহু ওয়া তা’ইয়ালা আমাদের কে আমর বিল মারুফ ওয়া নাহি আনিল মুনকার করার তৌফিক দিন। আমাদের অন্তর থেকে “ওয়াহন” দূর করে দিন। জালিম শাসক কে কাঠগড়ায় দাড় করানোর শক্তি দিন। ফিলিস্তিনের মুক্তির জন্য যেন মুসলিম সেনাবাহিনি একত্রে কাজ করতে পারে সে তৌফিক দিন। আমিন।

 

No comments: